৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে মামলা
নিরপরাধ ব্যক্তিদের দ্রুত অব্যাহতি দিতে হবে
- আপলোড সময় : ০১-০৩-২০২৬ ১২:৩১:০১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০১-০৩-২০২৬ ১২:৩১:০১ পূর্বাহ্ন
চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে মামলা দায়েরের প্রবণতা যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতা দমন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য মামলা একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত বিরোধ বা সুযোগসন্ধানী স্বার্থে ব্যবহৃত হয় - তখন তা ন্যায়বিচারের মৌলিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সরকারের দায়িত্বশীল মহলও এই বাস্তবতা স্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেই বলেছেন, ৫ আগস্টের পর কিছু ক্ষেত্রে নিরপরাধ মানুষকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং এসব মামলা যাচাই-বাছাই করা হবে। এই স্বীকারোক্তি যেমন ইতিবাচক, তেমনি এটি একটি গুরুতর সমস্যার প্রতিফলনও। কারণ, একটি রাষ্ট্রে নিরপরাধ নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করে।
পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। পুলিশ সদর দফতর-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা, নাশকতা, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হাজার হাজার ব্যক্তিকে নামীয় ও অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে, এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা হয়েছে। এতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
অবশ্য বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ও ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহার করে চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রথমেই কেন এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে যাচাই ছাড়াই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে? গণহারে এফআইআরে নাম অন্তর্ভুক্তির এই সংস্কৃতি আইনের শাসনের জন্য একটি বড় হুমকি।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন আওয়ামী লীগ-এর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও বিপুল সংখ্যক মামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতভেদ যদি আইনি হয়রানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। সরকার যে নির্দেশ দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে কার্যকর মনিটরিং থাকতে হবে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের দ্রুত অব্যাহতি দিতে হবে এবং যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় মিথ্যা মামলা দায়ের একটি সহজ ও নিরাপদ হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনের অপব্যবহার রোধে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংস্থা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
রাষ্ট্রের শক্তি তার আইনের কঠোরতায় নয়, বরং সেই আইনের ন্যায়সংগত প্রয়োগে নিহিত। মামলার সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং সঠিক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধকে সুরক্ষা দেওয়া - এই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়